
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সাভার অফিসে কর্মরত মোটরযান পরিদর্শক মোঃ আমিনুল ইসলাম খান বর্তমানে আলোচিত ও সমালোচিত এক নাম। সাধারণ সেবা গ্রহীতাদের কাছে তিনি দুর্নীতির প্রতীক এবং দালাল চক্রের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিজের জন্য গড়ে তুলেছেন শত কোটি টাকার সম্পদ এবং তার আশপাশের দালালরাও হয়ে উঠেছে ফ্ল্যাট-বাড়ির মালিক।
ক্ষমতার ছত্রছায়ায় দুর্নীতির পাহাড়
সূত্রে জানা যায়, আমিনুল ইসলাম খান গোপালগঞ্জ এলাকায় বিয়ে করে “জামাই” হওয়ার সুবাদে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, এমনকি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে গড়ে তুলেছেন সুসম্পর্ক। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি শুধু ঢাকাতেই নয়, নিজ এলাকা ও আশেপাশে বহু সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি অফিসের পেছনে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ি এবং অন্যান্য মূল্যবান সম্পদের মালিক হয়েছেন—যেগুলোর প্রকৃত উৎস ঘুষ ও ব্ল্যাক মানি (কালো টাকা)। অফিস সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগেও যার নিজস্ব কিছুই ছিল না, সেই আমিনুল এখন সরকারি চাকরির আড়ালে দুর্নীতির পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
দালালদের রাজত্ব ও সম্পদের বহর
শুধু আমিনুলই নন, তার আশপাশে গড়ে ওঠা দালাল চক্রের সদস্যরাও এখন সম্পদের মালিক। সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া পেঁয়ারা বাগান এলাকায় মোস্তফা কামাল নামে এক দালাল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এমন আরও বহু দালালের নাম উঠে এসেছে যারা বিআরটিএ সাভার অফিস থেকে মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে লাইসেন্স ও ফিটনেস জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
অফিসে অনিয়ম ও ক্ষমতার দাপট
বিআরটিএ’র নিজস্ব কর্মীদের অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, আমিনুল ইসলাম খান সময়মতো অফিসে আসেন না, অফিসে এসে সহকর্মীদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন এবং নিজেকে “সবচেয়ে ক্ষমতাধর কর্মকর্তা” হিসেবে দেখান। অফিসের অনেকেই বলেন, “টাকার গরমে মানুষকে মানুষ মনে করেন না।”
লাইসেন্স, ফিটনেস, পরীক্ষা – সবই ঘুষের ওপর নির্ভর
ভুক্তভোগীদের দাবি, যারা ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস বা যানবাহন সংক্রান্ত সেবা নিতে আসেন, তাদের ঘুষ না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয়। পরীক্ষায় পাস-ফেল করা হয় ইচ্ছামতো।
“যদি টাকা না দেন, আপনাকে ফেল করে দেবে, মাসের পর মাস ঘুরাবেন,” – জানালেন এক সেবাগ্রহীতা।
বিশেষ করে, ড্রাইভিং পরীক্ষায় ‘গ্যারাকলে’ ফেলে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করা হয়। পাশ করাতে হলে দালাল মারফত টাকা দিতে হয়। আর সরাসরি অফিসে গেলে কাজ আটকে দেওয়া হয়।
মহাসড়কে চলছে ফিটনেসবিহীন গাড়ির দাপট
জানা গেছে, গাবতলী-টাঙ্গাইল মহাসড়ক এবং ঢাকা-আরিচা-পাটুরিয়া সড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করছে, যেগুলো থেকে সরকার প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। কিন্তু এসব গাড়িকে ছাড়পত্র দিতে প্রতি গাড়িতে ঘুষ নেওয়া হয় ৫ হাজার টাকা করে। যারা টাকা দিতে অপারগ, তাদের ফিটনেস আটকে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও পরিচয় বিভ্রান্তি
সূত্র বলছে, আমিনুল ইসলাম খান নিজেকে কখনো আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট আবার কখনো বিএনপি নেতা বা ছাত্রদল কর্মী পরিচয় দিয়ে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন। একাধিক মহলের কাছে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরেন, তবে বাস্তবে তিনি একজন সুবিধাবাদী ও দ্বিচারী লোক বলে অনেকেই মন্তব্য করেন।
গণমাধ্যমকে দম্ভভরা বক্তব্য
এই ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে মোটরযান পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম খান স্পষ্টতই বলেন:
“আপনারা আপনাদের মতো নিউজ করেন। যেহেতু আপনারা জানেনই আমি কত কোটি টাকার মালিক, তাহলে বক্তব্য দিয়ে কী হবে? আমার অফিসে আসেন, সামনে কথা বলুন।”
এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, তিনি গণমাধ্যমকে তাচ্ছিল্য করেন এবং নিজের কর্মকাণ্ড নিয়ে মোটেও অনুতপ্ত নন।
বিআরটিএ ঢাকা জেলা সার্কেলের অধীন সাভার অফিসের চিত্র যেন দুর্নীতির ঘনঘটা। কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম খানের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য এখনই ভেঙে না দিলে, সরকার যেমন রাজস্ব হারাবে, তেমনি সাধারণ জনগণ দিনের পর দিন ভোগান্তির শিকার হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সাধারণ মানুষের দাবি:
আমিনুল ইসলাম খানের আর্থিক তদন্ত
দালালদের চিহ্নিত করে শাস্তি
বিআরটিএ’র কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা