
নারায়ণগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের একটি জেলা। নারায়ণগঞ্জ শহরে এ জেলার প্রশাসনিক সদর দপ্তর অবস্থিত। অত্যন্ত প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ সোনারগাঁও এ জেলার অন্তর্গত। নারায়ণগঞ্জ সোনালী আঁঁশ পাটের জন্য প্রাচ্যের ড্যান্ডি নামে পরিচিত। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর একটি বিখ্যাত নদীবন্দর। ৬৮৩.১৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ জেলাটি ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে ছোট জেলা। রাজধানী ঢাকার সাথে এ জেলার সীমানা রয়েছে।১৭৬৬ সালে হিন্দু ধর্মীয় নেতা বিকন লাল পান্ডে , যিনি বেণুর ঠাকুর বা লক্ষী নারায়ণ ঠাকুর নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিকট থেকে এ অঞ্চল অধীনে নিয়েছিলেন। তিনি প্রভু নারায়ণের সেবার ব্যয়ভার বহনের জন্য একটি উইলের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত মার্কেটকে দেবোত্তর সম্পতি হিসেবে ঘোষণা করেন। তাই পরবর্তীকালে এ স্থানের নাম হয় নারায়ণগঞ্জ।[২] কালেক্টরেটের প্রারম্ভিক দলিল-দস্তাবেজে নারায়ণগঞ্জের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়।আগমনের পর পর উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী নদী পথে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে সমুদ্র পথের চট্টগ্রাম বন্দর, কলকাতাসহ বিভিন্ন নদী পথে নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা চালু হয়। তখন কলকাতা ও আসাম থেকে যাত্রী এবং মালামাল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরে স্টিমার ভিড়তো। এ সময় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থান ভ্রমণের একমাত্র পথ ছিল নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর। এ জন্য নারায়ণগঞ্জকে বাংলা ভ্রমণের প্রবেশদ্বার বলা হতো। যাত্রী সাধারণের সুবিধার দিকে নজর দিয়ে ও মালামাল পরিবহন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ১৮৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন সার্ভিস চালু হয়। সব মেইল ট্রেন এই নারায়ণগঞ্জ থেকেই ছেড়ে যেত। ফলে ভারতবর্ষের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ শিল্প ও বন্দর নগরীর যোগাযোগ স্থাপিত হয়। স্থল পথ, জল পথ ও টেলিযোগাযোগের সুব্যবস্থার কারণে বিশ্ব বাণিজ্য বাজারে স্থান করে নেয়।
৫২-এর ভাষা আন্দোলন নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে স্মরণীয় ও বরণীয় এক অধ্যায়। যেহেতু নারায়ণগঞ্জ থেকে ২০ কি.মি. অদূরেই অবস্থিত ঢাকা জেলা, তাই পার্শ্ববর্তী জেলা হিসেবে পাকিস্তানি স্বৈরশাসককে উৎখাত করার জন্যই এ এলাকার জনগণ ছিল প্রতিবাদমুখর। তৎকালীন ছাত্রনেতা শামসুজ্জোহা, বজলুর রহমান, বদরুজ্জামান, মফিজ উদ্দিন, হাবিব রশিদ, সুলতান মাহমুদ মলিক, কাজী মজিবুর, শেখ মিজান ও এনায়েত নগরের শামসুল হক প্রমুখের নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে সক্ষম হন। এখনও এ অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে আত্মায় ধারণ করে প্রতিবৎসর ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রভাতফেরীতে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলাধীন সুসংঘঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার এম.এ গনি, মোহাম্মদ আলী, মোঃ নাসির উদ্দিন, মহিউদ্দিন রতন, নুরুল ইসলাম, মোঃ সামসুল হক, মমিনুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। ফতুল্লার পঞ্চবটিতে ডালডার মিল নামের এলাকা ছিল পাকসেনাদের দখলে। প্রতিরাতে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে যমুনা জেটির কাছে নিয়ে আসত এবং গুলিবর্ষণ করে হত্যার পরে লাশগুলো বুড়িগঙ্গা নদীর জলে নিক্ষেপ করে ভাসিয়ে দেওয়া হতো বলে জানা যায়। মুক্তিযোদ্ধা দুলাল ও আমিনুর ডিক্রিরচর ও কানাই নগরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি শক্তিশালী গ্রুপ তৈরী করেন। বাবুরাইলের মুক্তিযোদ্ধা শরিফুল আশ্রাফ যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব দেখাতে সক্ষম হন।নারায়ণগঞ্জ জেলা রাজধানী ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পূর্বে, ২৩°৩৩’ থেকে ২৩°৫৭’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০°২৬’ থেকে ৯০°৪৫’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। এর জেলা উত্তরে নরসিংদী জেলা, গাজীপুর জেলা এবং দক্ষিণে মুন্সীগঞ্জ জেলা, পূর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ও কুমিল্লা জেলা, পশ্চিমে ঢাকা। নারায়ণগঞ্জ জেলার মোট আয়তন ৬৮৪.৩৫ বর্গ কিলোমিটার। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর গড় উচ্চতা ১৩ মিটার বা ৩২ ফুট।[৩] ভূসংস্থান অনুসারে এ জেলা গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার পাললিক মাটির সমতল ভূমি। জেলার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১৭৭৭ মিলিমিটার। বছরের অধিকাংশ সময়ই এখানে ক্রান্তীয় গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করে। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো এ উপজেলাতেও এপ্রিল থেকে জুন হলো সবচেয়ে উষ্ণতম মাস, যার তাপমাত্রা থাকে সর্বোচ্চ ৩৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি হলো সবচেয়ে শীতলতম মাস, তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ১২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।২৯২ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয় যা ৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। ১৮৮২ সালে নারায়ণগঞ্জ মহকুমা ঘোষিত হয়, যা ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয়। ২০১১ সালের ৫ই মে নারায়ণগঞ্জ সদর পৌরসভা, বন্দর থানার কদমরসুল ও সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভা সমন্ময়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন করা হয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলায় উপজেলা ৫টি। সেগুলো হল –
সম্পাদনা
ক্রমিক নং উপজেলার নাম সমূহ
০১ নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা
০২ বন্দর উপজেলা
০৩ আড়াইহাজার উপজেলা
০৪ রূপগঞ্জ উপজেলা
০৫ সোনারগাঁও উপজেলা
নারায়ণগঞ্জ জেলা সর্বমোট ৭টি থানায় বিভক্ত করা হয়েছে।
সম্পাদনা
ক্রমিক নং থানার নাম সমূহ
০১ নারায়ণগঞ্জ সদর থানা
০২ ফতুল্লা থানা
০৩ সিদ্ধিরগঞ্জ থানা
০৪ বন্দর থানা
০৫ সোনারগাঁও থানা
০৬ রূপগঞ্জ থানা
০৭ আড়াইহাজার থানা২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা হলো ৩০,৭৪,০৭৭ জন। ২০১১ সালের আদমশুমারী ও গৃহগণনা অনুসারে নারায়ণগঞ্জ জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৯৪৮২১৭ জন[৪] (জাতীয় জনসংখ্যার ২.০৫%, যা মঙ্গোলিয়ার মত একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের জনসংখ্যার সমান[৫] বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া রাজ্যের মোট জনংখ্যার সমান। জেলায় পুরুষ জনসংখ্যা ১৫২১৪৩৮ জন এবং নারী জনসংখ্যা ১৪৬৭৭৯ জন। নারী ও পুরুষের লিঙ্গ অনুপাত ১০৭:১০০, যা জাতীয় অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশি। ২০০১-২০১১ এর দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৩.৫%। জেলায় জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৩০৮ জন বা প্রতি বর্গমাইলে ১১১৫৭ জন মানুষ বসবাস করে। গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৬৬৮ জন। ২০১৫ সালের জেলা পরিসংখ্যান তথ্য অনুযায়ী এ জেলায় স্বাক্ষরতার হার ৫৭.১০%, নারী স্বাক্ষরতার হার ৫৯.৪৮% এবং পুরুষ স্বাক্ষরতার হার ৫৪.৫৬%, যা জাতীয় স্বাক্ষরতার হার ৬৬.৪% এর চেয়ে কম। জেলায় ৬৭৫৬৫২ টি খানা বা পরিবার রয়েছে, প্রতি পরিবারের আকার ৪.৩৪%।
জেলা পরিসংখ্যান অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলার মোট জনসংখ্যার মধ্যে ২৮০২৫৬৭ জন মুসলমান, ১৪৪১০৫ জন হিন্দু, ৯৬৩ জন খ্রিস্টান, ৩৭৮ জন বৌদ্ধ এবং ২০৪ জন অন্যান্য ধর্মের অনুসারী।[১] ধর্মহীন বা নাস্তিকদের কোন পরিসংখ্যানগত সরকারি তথ্যরপ্তানী শিল্পে পাট যখন বাংলাদেশের প্রধানতম পণ্য, তখন নারায়ণগঞ্জ “প্রাচ্যের ডান্ডি” নামে খ্যাত থাকলেও বর্তমানে নিট গার্মেন্টস ও হোসিয়ারী শিল্পের জন্য সুপরিচিত। নিটওয়্যার রপ্তানীকারকদের সংগঠন “বিকেএমইএ” ও হোসিয়ারী শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রধান কার্যালয় “হোসিয়ারী সমিতি” নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত। ফতুল্লা এনায়েতনগর এলাকায় অবস্থিত বিসিক শিল্পনগরীতে প্রায় ৭০০ গার্মেন্টস আছে। সারা নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রায় ১ হাজার রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস আছে। এগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ গার্মেন্টসই নিট গার্মেন্টস। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের তৈরী পোশাক রাজধানী ঢাকাতে ও বেশ সুনাম অর্জন করতে পেরেছে।
বর্তমানেও নারায়ণগঞ্জ পাট শিল্পের জন্য বিখ্যাত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজী পাটকল নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত ছিল যা বর্তমানে বন্ধ করে আদমজী ইপিজেড গড়ে তোলা হয়েছে। পাট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশন বা বিজেএ এর প্রধান কার্যালয় নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত।
দেশের প্রধান নদীবন্দর নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত যা শতবছরের পুরনো। সবচেয়ে বড় সারের পাইকারী বাজার নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত। দেশের প্রধানতম লবণ কারখানা ও নির্মাণ সামগ্রীর পাইকারী বাজারের জন্য ফতুল্লা বিখ্যাত। এছাড়া লবণ, গম, আটা ও ময়দা পাইকারী ব্যবসা ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। দেশের প্রধানতম সিমেন্ট কারখানাগুলো সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা নদীর তীরজুড়ে গড়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ ও রূপগঞ্জ উপজেলা ব্যতীত সকল উপজেলার প্রধান অর্থনীতি হলো কৃষি।
রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁও অঞ্চলের জামদানি ও মসলিনের কাপড় তৈরির ইতিহাস প্রায় সাড়ে ৪ শত বছরের পুরোনো। ইতিহাস খ্যাত মসলিন কাপড় প্রাচীনকালে এখানে তৈরী হতো। মিশরের মমির শরীরে পেচানো মসলিন এই সোনারগাঁয়ের তৈরি বলে জানা যায়। বর্তমানে জামদানি শিল্প টিকে থাকলেও মসলিন শিল্প বিলুপ্ত।
নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে ছোট বড় অনেক ব্যবসা কেন্দ্র। এক কথায় বলা যায় চাষাড়া এখন নারায়ণগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র। এছাড়া বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে অন্যতম ফ্যাশন ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ এর যাত্রা শুরু হয় এই জেলা থেকেই।নারায়ণগঞ্জে জেলার শিক্ষার হার ৮৫.১৫%। এই জেলার শিক্ষার মান অত্যন্ত উন্নত মানের। জেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কম থাকলেও ঢাকা সিটির সাথে থাকায় সহজেই শিক্ষার্থীরা সহজেই শিক্ষা লাভ করতে পারে। নারায়ণগঞ্জ জেলায় ১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি মিলে মোট ২০ টি কলেজ, ২০ টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়(একই সাথে স্কুল ও কলেজ), ভোকেশনাল স্কুল ২, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১২৭, প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪৫৮, কিন্ডার গার্টেন ৭৬ ও মাদ্রাসা ৫৬ রয়েছে। হামদার্দ বিশ্ববিদ্যালয় সোনারগাও উপজেলায় অবস্থিত, দেশের সর্বপ্রথম স্থাপিত মেরিন ও শিপবিল্ডিং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট এখানে রয়েছে। এছাড়া সরকারি তোলারাম কলেজ ও নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।